July 28, 2026, 10:08 pm

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধ, চুক্তি সইয়ের দ্বারপ্রান্তে দুই পক্ষ

  • Update Time : Sunday, June 14, 2026
  • 37 Time View

মধ্যপ্রাচ্যে গত তিন মাস ধরে চলা বিধ্বংসী যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তবে চুক্তি স্বাক্ষরের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা এবং এর শর্তাবলি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্পষ্ট দ্বিমত দেখা দিয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে আজ রোববারের মধ্যেই এই চুক্তি সই হতে পারে, কিন্তু ইরান এই সময়সীমা প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আরও কিছু দিন সময়ের প্রয়োজন হতে পারে।

বর্তমানে যুদ্ধ পরিস্থিতি, যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব, হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব এবং ইসরায়েলের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে একটি বিস্তারিত পর্যালোচনা নিচে তুলে ধরা হলো।

ট্রাম্পের দাবি বনাম ইরানের অবস্থান, চুক্তি আসলে কবে?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ঘোষণা করেছেন যে, ইরান যুদ্ধ বন্ধের জন্য একটি রূপরেখা চুক্তি আজ রবিবারের মধ্যেই স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। ট্রাম্পের এই আশাবাদের সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে আলোচনার মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের কণ্ঠেও।

তিনি জানিয়েছেন যে, একটি চূড়ান্ত ও সম্মত খসড়া তৈরি করা হয়েছে এবং আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এটি বৈদ্যুতিন বা ইলেকট্রনিক উপায়ে সই হতে পারে।

তবে তেহরান এই দ্রুত সময়সীমা নিয়ে সরাসরি আপত্তি জানিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই স্পষ্ট করে বলেছেন যে, ১৪ জুনের মধ্যে কোনো সমঝোতা স্মারক  সই হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

ইরানের আধা-সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সির মতে, তেহরান এখনও এই প্রস্তাবিত খসড়ার ওপর কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে আগামী দিনগুলোতে এই চুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনা তারা একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছে না। বর্তমানে কাতারের একটি মধ্যস্থতাকারী দল চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে তেহরানে অবস্থান করছে।

চুক্তির মূল শর্তাবলি ও বৈপরীত্য

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান উভয় পক্ষই এই সম্ভাব্য চুক্তিকে নিজেদের ‘বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে, যার ফলে চুক্তির ভেতরের আসল শর্ত নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

ইরানের দাবি, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দাবি করেছেন যে, এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

ইরানি গণমাধ্যমের সূত্রমতে, চুক্তির প্রথম ধাপে সব ফ্রন্টে (লেবাননসহ) যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে, ইরানের অবরুদ্ধ থাকা ২৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করা হবে এবং ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল বিক্রির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে নেওয়া হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, অপরদিকে ওয়াশিংটনের কর্মকর্তাদের দাবি, ট্রাম্পের মূল লক্ষ্যগুলো এই চুক্তিতে অর্জিত হয়েছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই চুক্তি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরীর পথ থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখবে এবং চুক্তি সইয়ের পরপরই হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন জোর দিয়ে বলেছে যে, ইরান নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত কোনো অর্থ ছাড় করা হবে না।

হরমুজ প্রণালী কেন ছাড়তে চায় না ইরান?

এই যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলো কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ । বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র এই প্রণালীতে নৌ-অবরোধ আরোপ করার পর ইরানও এর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার হুমকি দেয়।

অস্ট্রিয়ান সরকারের সাবেক প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে ভলফগ্যাং পুসতাই আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা ইরানের জন্য তার পারমাণবিক কর্মসূচির মতোই একটি বড় ‘রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার।

তিনি উল্লেখ করেন, এটি ইরানের কাছে এক ধরনের পারমাণবিক বোমার মতো শক্তিশালী অস্ত্র। এই হাতিয়ার ব্যবহার করে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, আঞ্চলিক অন্যান্য দেশ এবং পরোক্ষভাবে ইসরায়েলকে চাপে রাখে। ফলে তারা সহজে এই সুবিধা হাতছাড়া করতে চাইবে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান যদি সাময়িকভাবে এই প্রণালী সবার জন্য উন্মুক্ত করতে রাজিও হয়, তবুও দীর্ঘমেয়াদে তারা এর কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চাইবে, যাতে ভবিষ্যতে যেকোনো সংকটে এটিকে আবারও চাপ সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

ইসরায়েল কি এই চুক্তি নস্যাৎ করতে পারে?

এই সম্ভাব্য মার্কিন-ইরান চুক্তি ইসরায়েলের ভেতর তীব্র অসন্তোষ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে এই নিয়ে প্রকাশ্য বিরোধ তৈরি হয়েছে। ওয়াশিংটন চাইছে লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান সীমিত করা হোক, যাতে তেহরানের সাথে একটি টেকসই চুক্তিতে পৌঁছানো যায়। কিন্তু ইসরায়েল তা মানতে নারাজ।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের আক্রমণ চালিয়ে যাবে।

ইরানপন্থী গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ওপর হামলা অব্যাহত রেখে ইসরায়েল ইরানকে উস্কানি দিতে পারে, যাতে ইরান পাল্টা আঘাত করতে বাধ্য হয় এবং ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিটি ভেঙে পড়ে।

ইসরায়েল যদি ইরানের পারমাণবিক বা শিল্প অবকাঠামোতে (যেমন সম্প্রতি দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের মাহশাহর পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে হামলা হয়েছে) নতুন করে আঘাত হানে, তবে তা আমেরিকার এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ করে দিতে পারে।

যুদ্ধবিরতির বর্তমান পরিস্থিতি, এটি কি আসলেই শেষ?

গত এপ্রিল মাস থেকে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের পর একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলে আসছিল। তবে জুন মাসের শুরুতে এসে এই যুদ্ধবিরতি চরম হুমকির মুখে পড়েছে। হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের তীব্র সামরিক অভিযান এবং এর জবাবে ইসরায়েলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে।

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ অভিযোগ করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আসলে কোনো প্রকৃত যুদ্ধবিরতি বা সংলাপ চায় না, বরং তারা ইরানের অধিকার হরণ করতে চায়। অন্যদিকে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করেছেন যে ইরান যদি আবারও ইসরায়েলে আঘাত করার ভুল করে, তবে তার জবাব হবে অত্যন্ত কঠোর।

বর্তমানে লেবাননে চলমান সংঘাতই মূলত এই মার্কিন-ইরান শান্তি চুক্তির ভাগ্য নির্ধারণ করবে। লেবাননে যদি একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা না যায়, তবে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করা বা ৬০ দিনের জন্য একটি আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার যে ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা হচ্ছে, তা যেকোনো মুহূর্তে ভেস্তে যেতে পারে।

ভবিষ্যৎ কোন দিকে?

মধ্যপ্রাচ্যের এই ১০৭তম দিনে এসে বিশ্ব এক অত্যন্ত জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান ও কাতার দ্রুত একটি চুক্তির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী সচল ও তেলের বাজার স্থিতিশীল করতে মরিয়া, অন্যদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো (যেমন মাশহাদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ) এই চুক্তির বিরোধিতা করছে।

আগামী কয়েক দিন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির জন্য অত্যন্ত সংকটময়। মার্কিন-ইরান সমঝোতা স্মারকটি শেষ পর্যন্ত সই হয় কি না, এবং ইসরায়েল এই চুক্তিকে মেনে নেয় নাকি নতুন সামরিক অভিযানের মাধ্যমে এটিকে নস্যাৎ করে, তার ওপরেই নির্ভর করছে এই অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category